আয়কর ফাঁকির অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবেশের সম্ভাবনা কতটুকু?

আয়কর ফাঁকির অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবেশের সম্ভাবনা কতটুকু? আয়কর ফাঁকির অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবেশের সম্ভাবনা কতটুকু?

MarketDeal24.Com – মহামারী সংক্রামক করোনা ভাইরাসের নির্দয় থাবায় সমগ্র পৃথিবী অচল। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে দাঁড়িয়েছে সর্বত্র। আশঙ্কায় বাংলাদেশ ও সমগ্র বিশ্ব। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় অনেক রাষ্ট্র এরই মধ্যে প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, মূল উদ্দেশ্য সংকটকালীন সময়ে বাড়তি অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করা।

বাংলাদেশে ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্রোগ্রাম ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। সেই সাথে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে অপ্রদর্শিত হিসেবে থেকে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থকে যদি অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসা যায়, তবে তা আসন্ন অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত অর্থকে মূলধারায় ফেরাতে বড় আকারের ছাড় ঘোষণার আশা করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।

আয়কর আইন জানাচ্ছে, আয়ের যে অংশ আয়কর বিবরণীতে দেখানো হয় না, সেটিই অপ্রদর্শিত অর্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব ক্ষেত্রে উৎকোচ, দুর্নীতি, কালোবাজারি, চোরাকারবার, অসদুপায় অবলম্বন, মাদক ও অস্ত্রসহ রাষ্ট্রের আইন কর্তৃক নিষিদ্ধ পণ্যের ব্যবসা হতে উপার্জিত আয়কে ধরে নেয়া হয় অপ্রদর্শিত অর্থ হিসেবে। সেই সঙ্গে কেউ যদি তার বৈধ উৎস হতে আয়ের বিপরীতে কর পরিশোধ না করে থাকে, তাহলে সেটিও অপ্রদর্শিত অর্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।

দেশে অপ্রদর্শিত অর্থের অঙ্কটা ঠিক কত তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও পরিসংখ্যান নেই। তবে বিশ্বব্যাংকের ২০০৫ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, ২০০২ থেকে ২০০৩ সালেও বাংলাদেশে অপ্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ ছিল মোট জিডিপির ৩৭.৭%। অপরদিকে গত বছরের ২৮শে জুন ২০১৯ থেকে ২০২০ অর্থবছরের বাজেট শীর্ষক এক আলোচনায় সরকারি একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত বলেন, দেশে অপ্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ জিডিপির ৪২ থেকে ৮০% এর মধ্যে।

Forexmart

অর্থের অংকে এর পরিমাণ অন্ততপক্ষে সাড়ে ১৭ লাখ কোটি টাকা, যা তিনটি বাজেটের সমপরিমাণ। আর পুঞ্জীভূত অপ্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ ৩০ থেকে ৪০ লাখ কোটি টাকার মত, যা বর্তমান সময়ের জিডিপির দ্বিগুণ। অতিসম্প্রতি ক্যাসিনো কাণ্ডেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে প্রচুর পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ জব্দের ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই)

এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) প্রেসিডেন্ট শামস মাহমুদ জানান, আমাদের দেশে কী পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ রয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে না। তাই সুযোগ প্রদান করা হলে কী পরিমাণ অর্থ অর্থনীতির মূলধারায় প্রবেশ করবে, সেটিও আগে থেকেই বলা সম্ভব নয়। তদুপরি দেশের ভেতরে যে পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ আছে, তার সিংহভাগ এরই মধ্যে জমি, ফ্ল্যাট, প্লট ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করা আছে। তাই এখান হতে নতুনভাবে বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

অপরদিকে এ সংকটের সময় যাদের নিকট অপ্রদর্শিত অর্থ রয়েছে, তারা সেটি ধরে রাখতে চাইবে। তেমনটাই স্বাভাবিক। কারণ করোনা সংক্রমণের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছে। তবে অপ্রদর্শিত অর্থকে মূলধারায় আনার সুযোগ প্রদান করা হলে সেটি যদি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতে পারে। তবে এমতাবস্থায় অর্থনীতিতে যে কোনও উৎসের অবদান যোগ হলে সেটি আমাদের জন্য কল্যাণকর।

বিশ্বব্যাংকের আগাম প্রক্ষেপণ বলছে, মহামারী করোনার প্রভাবে চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০) দেশের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে ২-৩ শতাংশে, যে চিত্রটি ৩০ বছর আগে প্রত্যক্ষ করেছিল বাংলাদেশ। সম্প্রতি সংস্থাটির ওয়াশিংটন কার্যালয় থেকে বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত “সাউথ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস, স্প্রিং ২০২০: কার্সড ব্লেযিং অভ পাবলিক ব্যাংক” শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন পূর্বাভাস দেয়া হয়।

বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে ২-৩ %

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে ২ থেকে ৩ শতাংশ। তারপর আগামী অর্থবছরে তা আরও হ্রাস পেয়ে পৌঁছতে পারে ১.২ থেকে ২.৯ শতাংশে। তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে অর্থনীতি মোড় নিতে পারে। তখন প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ২.৮ থেকে ৩.৯ শতাংশের মধ্যে।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের এপ্রিল ইস্যুতে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশসমূহের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস প্রদান করা হয়। সে অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২% এ গিয়ে দাঁড়াবে। তবে ২০২১ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেড়ে সাড়ে ৯% এ উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

অপ্রদর্শিত অর্থকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসা সম্ভব হলে তার প্রভাব ইতিবাচক হবে বলে মনে করছেন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুনতাকিম আশরাফ। গণমাধ্যমে তিনি বলেন, করোনা সৃষ্ট এ সংকটকালে যদি অপ্রদর্শিত অর্থকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই অত্যন্ত ইতিবাচক হবে। সেই সঙ্গে এ সময়ে যাতে দেশে খাদ্য সংকট সৃষ্টি না হয়, তার জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নয়তো সংকট মোকাবেলা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশের আয়কর অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত করের অতিরিক্ত জরিমানা দিয়ে যেকোনো খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ আছে। এছাড়া প্লট-ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রেও প্রতি বর্গমিটারের জন্য নির্দিষ্ট হারে কর দিয়েও এ সুযোগ গ্রহণ করা যাবে।

বাংলাদেশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)

সর্বশেষ চলতি অর্থবছরের বাজেটেও কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে নির্দিষ্ট হারে কর প্রদানসাপেক্ষে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে শিল্প ও সেবা খাতে ১০% কর প্রদান করে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করা হলে বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করবে না। এ সুবিধা পাওয়ার জন্য হাইটেক পার্ক বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে হবে। এ সুযোগ অব্যাহত থাকছে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। তার সঙ্গে জমি কেনার কাজেও অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহার করা যাবে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে জরিমানা প্রদানের মাধ্যমে মোট ১৮ হাজার ৩৭২ কোটি টাকার অপ্রদর্শিত অর্থ অর্থনীতির মূলধারায় ফিরে এসেছে। এর অর্ধেকই এসেছে ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়।

বহুদিন ধরেই পুঁজিবাজারে আর্থিক সম্পদের সরবরাহ বাড়াতে শর্তসাপেক্ষে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার দাবি তুলে আসছেন সংশ্লিষ্টরা। আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনায়ও চলমান পরিস্থিতিতে অর্থনীতির মূলধারার বাইরে থাকা অপ্রদর্শিত অর্থ কমপক্ষে তিন বছর বিনিয়োগের শর্তে এবং ৭.৫% হারে কর প্রদান সাপেক্ষে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)। এর মাধ্যমে জনজীবন তথা সার্বিক অর্থনীতি গতিশীল হবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।

এ বিষয়ে বিএমবিএর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ছায়েদুর রহমান জানান, অপ্রদর্শিত অর্থকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা গেলে সেটি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণে কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করা হলে এনবিআরসহ সরকারের কোনো সংস্থাই এ অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না, এমন বিধান করতে হবে। তাহলে যাদের কাছে অপ্রদর্শিত অর্থ রয়েছে, তারা সেটিকে বৈধ করার ক্ষেত্রে আগ্রহী হবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।

সপ্তাহের বাজারে লক্ষ্য রাখার মতো ৫টি বিষয় | ২০শে এপ্রিল – ২৪শে এপ্রিল, ২০২০

leave a reply