ছড়িয়ে যাওয়া অনিশ্চয়তা: আগামী দিনগুলোতে অর্থনীতির হাল

1
170 views
ছড়িয়ে যাওয়া অনিশ্চয়তা: আগামী দিনগুলোতে অর্থনীতির হাল
ছড়িয়ে যাওয়া অনিশ্চয়তা: আগামী দিনগুলোতে অর্থনীতির হাল

(রয়টার্স) – নিম্নে উল্লিখিত বিষয়গুলো আগামী দিনগুলোতে বিনিয়োগকারী এবং ট্রেডারদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে আমাদের ধারণা।

আত্মমন্থনের সময় হয়তো এসেছে?

2.6 ট্রিলিওন ইউরো অর্থনীতিতে সঞ্চালন এবং সুদেরহার দফায় দফায় হ্রাস করার পরে ইউরোজোনের কেন্দ্রীয়ব্যাংক ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক শেষমেশ স্বীকার করেছে যে তাদের দ্বারা নির্ধারিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন এখনো হয়নি, এবং সাধারণত জরুরি অবস্থায় আবির্ভূত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্যে নেয়া এই ধরণের উদ্যোগ আরও বেশ কিছু দিন বহাল রাখতে হবে।

তবে নিজেদের ভুল স্বীকার করার প্রক্রিয়ায় ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক একা নয় বরং সারা বিশ্বব্যাপি এই ধরণের একটি চিন্তাধারা বিদ্যমান।




কেন্দ্রীয়ব্যাংক যখন বন্ড ক্রয়ের মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতিতে মুদ্রার হার বৃদ্ধি করে থাকে তখন তাকে বলা হয় “quantitative easing”, যেটা প্রায় কয়েক দশক ধরে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক করে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, মার্কিন কেন্দ্রীয়ব্যাংক ফেডারেল রিসার্ভ তার নীতির স্বাভাবিকীকরণকে কঠিন মনে করছে। শুধু তাই নয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভরবেগের স্থবিরতা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, এবং সুইডেনের কেন্দ্রীয়ব্যাংকগুলোকে তাদের নির্ধারিত নীতির সংকোচনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে।

এই সকল বিষয়গুলো খুব স্পষ্টভাবে চলমান অর্থনৈতিক চিন্তাধারার বিষয়ে আলোকপাত করে। পাশ্চাত্য এই চিন্তাধারাকে MMT বা Modern Monetary Theory বলা হয়।

এই থিওরি বা তত্ত্ব মূলত মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থীদের দ্বারা প্রদত্ত। এই তত্ত্বের সমর্থকরা বলে থাকেন যে, যেসকল দেশগুলোর মুদ্রাকে রিসার্ভ কারেন্সী হিসেবে রাখা হয় সেই সকল দেশের সরকার যেন মুদ্রাস্ফিতির হারকে বর্তমান পর্যায়ে রেখে, সুদেরহারকে শূন্যে নামিয়ে তাদের অর্থগুলো যাতে পরিবেশের উন্নয়ন এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করে।

সুদের হার শূন্যে এবং মুদ্রাষ্ফীতির হার কাঠামোগতভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকা অবস্থায় সরকারের দ্বারা পরিচালিত ঘাটতি বাজেট দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃতরূপে জীবনের মান উন্নয়নে কাজ করবে।

এই ধরণের চিন্তাভাবনা ব্রিটেনের বিরোধীদল, লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন কর্তৃক প্রস্তাবিত “জনগণের QE নীতি” এবং সমগ্র ইউরোপব্যাপি বিশেষ করে ইতালির ক্ষমতাসীন জোট সরকারের অর্থনৈতিক ভাবধারারই আর এক নাম মাত্র।

তবে মূলধারার অর্থনীতিবিদরা এই ধরণের চিন্তাভাবনার ঘোর বিরোধী। তাদের মতে এই ধরণের অর্থনৈতিক নীতিকে একটি রোগের চিকিৎসা হাতুড়ে ডাক্তারদের দ্বারা পরিচালিত রোগ নিরাময়ের পদ্ধতিকেই ইঙ্গিত করে।

কারণ এই চিন্তা বা তত্ত্বের আলোকে সরকারের ব্যায়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারণের দায়িত্ব অর্থ এবং বন্ডমার্কেটের গতিপ্রকৃতির উপরে ছেড়ে দেয়া হয়।

তবে বাস্তবতা হলো এই যে, ইউরোপ চলমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা দীর্ঘদিনধরে চলমান এবং সর্বজনবিদিত অর্থনৈতিক ধ্যান ধারণাকেও অনেকটা ভুল প্রমাণিত করেছে।  

আগামী দিনগুলোতে যেভাবে ইউরোপের পার্লামেন্টের এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে ঠিক তার সাথে তাল মিলিয়ে এই তত্ত্বের বিষয়ে স্তুতিবাক্য শুনার জন্যে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে।

ব্রেকিং পয়েন্ট

তিন দিনে তিন ভোট! আসছে ১২ তারিখে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট বিষয়ে আর একটি ভোটাভুটি হওয়ার কথা।

এই ভোটে যদি ব্রিটিশ সরকার হেরে যায় তাহলে খুব সম্ভবত কোনো ধরণের চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের দিকে এগিয়ে যাবে দেশটি।

কারণ এখন পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারকে ব্রেক্সিট বিষয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নতুন করে কোনো ধরণের ছাড় দেয়নি। যা হবে ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ডের জন্যে একটি ক্ষতির কারণ।

১৩ তারিখে যদি ব্রিটিশ সরকার এই ভোটাভুটিতে পরাজিত হয় তাহলে তার পরের দিন ১৪ তারিখে এবং ১৫ তারিখে পুনরায় ভোটাভুটি উনুষ্ঠিত হবে, এবং ঐ সকল ভোটাভুটিতে ব্রিটিশ আইনপ্রণেতারা চুক্তিহীন ব্রেক্সিটকে এড়ানোর জন্যে ব্রেক্সিটের মেয়াদ আরও বৃদ্ধি করতে পারেন।

আর যদি তাই হয় তাহলে তা বাজারের উদ্বিগ্নতাকে আপাতত প্রশমিত করবে অথবা অনিশ্চয়তার পর্বকে করবে আরও প্রলম্বিত।

রয়টার্স দ্বারা পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী খুব সম্ভবত ব্রেক্সিটের মেয়াদে বৃদ্ধি করা হবে যা হয়তো একধরণের বাণিজ্যিক চুক্তি করার পথ উন্মুক্ত করতে পারে। তো এর কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা স্পষ্টভাবেই প্রতিফলিত হচ্ছে কারেন্সী ডেরাইভেটিভস এর বাজারে।

ক্রেতাদের ধর্মঘট?

খুচরা বাণিজ্য বিষয়ক মার্কিন অর্থনীতির গত ডিসেম্বর মাসের নেতিবাচক প্রতিবেদনটি কি মাঝেমধ্যে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন কোনো দুরাবস্থাকে তুলে ধরে নাকি এটি কোনো নতুন ট্রেন্ড বা প্রচলন শুরু হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে আসছে সোমবারে যখন জানুয়ারী মাস সম্পর্কিত এইরকম একটি প্রতিবেদন জনসম্মুক্ষে প্রকাশ করা হবে।

এই প্রতিবেদনটি অবশ্য তার প্রকাশিত হবার নির্ধারিত তারিখ থেকে তিন সপ্তাহ দেরিতে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে কারণ হলো ডিসেম্বর এবং জানুয়ারী মাসে মার্কিন সরকারের শাটডাউন।

সারা বিশ্বব্যাপি চলমান অর্থনৈতিক স্থবিরতার মাঝে মার্কিন অর্থনীতি এবং ভোক্তারা কেমন অবস্থায় আছেন তা অনেকটা টের পাওয়া যাবে এই প্রতিবেদনে।

বিশেষজ্ঞদের মতে মার্কিন খুচরা বাণিজ্য গত জানুয়ারী মাসে 0.1% হরে বৃদ্ধি পেয়েছে যা তার পূর্ববর্তী মাসে কমেছিলো 1.2% হরে, যা ছিলো ২০০৯ সালের তুলনায় সবচেয়ে বড় পতন। খুচরা বাণিজ্যের স্বাস্থ্যের অবস্থা বিশ্লেষণের জন্যে নির্ধারিত অন্যান্য মাপকাঠিগুলো যেমন “খুচরা বাণিজ্যের কোর মেজার” (core measure) কমেছিলো 1.7% হরে যা ২০০১ সালের তুলনায় সবচেয়ে বড় পতন।

এতো নেতিবাচক তথ্যের সাথে তুলনা করলেও গত ডিসেম্বর মাসের মার্কিন অর্থনীতিতে অনলাইন সেলস এর পরিমানে পতন ছিলো ২০০৮ সালে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক মন্দার সময়ের পর থেকে সবচেয়ে বড় পতন।

আসছে প্রতিবেদনে যদি আর একটি মাসের ব্যপারে নেতিবাচক তথ্য এসে তাহলে তা নিশ্চিত করবে যে অর্থনৈতিক স্থবিরতার কালো মেঘ আরও কালো হয়েছে এবং মার্কিন সরকার কর্তৃক দেয়া প্রণোদনার প্রভাব এখন সম্পূর্ণরূপে শেষ।

স্থির এবং স্থবির

চীনে অনুষ্ঠিত সেই দেশের আইনসভা, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশন থেকে আগত বার্তাগুলো বিশ্লেষণ করলে এই বিষয়টি খুবই স্পষ্ট যে অর্থনৈতিক অঙ্গনে তারা একটি জিনিস চান: স্থিরতা।

এই কারণেই সেই দেশটির প্রশাসন চলমান বছরে অর্জিতব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষমাত্রা 6.5% এর একটি একক সংখ্যা থেকে কমিয়ে এনে তা 6.0% – 6.5% এর একটি রেঞ্জ আকারে নির্ধারণ করা হয়েছে।

লক্ষমাত্রা অর্জনের স্বার্থে কমানো হয়েছে আরোপিত করের হার কিন্তু আবার অন্যদিকে, আর্থিক সম্প্রসারণকে ২০১৫ সালের মাত্রা থেকে কমে রাখা হয়েছে, এবং সব কিছুর মূলে দেশটির মুদ্রা ইউয়ানের স্থিরতাকে করা হয়েছে অবশ্য করণীয়।

চলমান এই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে একজন বিশ্লেষকের মনে এই ধারণা স্বাভাবিকভাবেই আসবে যে চীন যদি তার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার 6.0% এর উপরে রাখতে চায় তাহলে তাকে ঋণের হরে প্রবৃদ্ধি এবং ঘাটতি বজেটের বিষয়ে আরও নমনীয় হতে হবে।

কিন্তু সদ্য সমাপ্ত ফেব্রুয়ারী মাসে চীনের রপ্তানি বাণিজ্য ২০ ভাগেরও বেশি মাত্রায় কমে যাওয়া অন্যদিকে, আমদানি বাণিজ্যেও হ্রাস দেশটির সুদের হরে বড় ধরণের কমতিকে সময়ের ব্যাপার করেছে মাত্র।

এমতাবস্থায় শিল্পউৎপাদন, খুচরা বাণিজ্য, গৃহায়নখাত, এবং ঋণ সরবরাহ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে যাচ্ছে মার্কিন-চীন বাণিজ্য চুক্তি বিষয়ের আলোচনার ফলাফল সম্পর্কিত অনিশ্চয়তার মধ্যে।

উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর উপরে চাঁপ

সাম্প্রতিক সময়ে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনার নেতৃত্বে সেই সকল দেশের মুদ্রাগুলোর মূল্যমানে পতন লক্ষ্য করা গিয়েছে। এতে তুরস্কের মুদ্রা লিরা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মুদ্রা রান্ডও রয়েছে।

এর জন্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো মার্কিন মুদ্রা ডলারের শক্তিশালী হওয়া।

কিন্তু অনুঘটক হিসেবে সেই সকল দেশগুলোর অভ্যন্তরীন অবস্থাকেও দোষ দেয়া যায়। সেই সকল দেশগুলোর রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উচ্চ মাত্রার মুদ্রাস্ফীতি ছাড়াও আর একটি বিষয় হলো যে, আর্জেন্টিনা, তুরস্ক, এবং দক্ষিণ আফ্রিকা নিজ দেশের উন্নয়নের জন্যে বৈদেশিক অর্থায়নের উপরে জোরালোভাবে নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাপি অর্থনৈতিক স্থবির করেতুলেছে এই সমীকরণকে আরও জটিল।

ফরেক্স নিয়ে বাংলা বই ক্রয় করতে – https://goo.gl/Tj3vaj


Facebook Comments

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.