ফরেক্স কি ?

1
2,353 views
ফরেক্স কি ?
ফরেক্স কি ?

ফরেক্স সম্পর্কে মৌলিক ধারণা

ফরেক্স কি?

ফরেন এক্সচেঞ্জ বা সংক্ষেপে ফরেক্স হলো একটি দেশের মুদ্রার বিনিময়ে অন্য কোনো দেশের মুদ্রা ক্রয় বা বিক্রয়ের জন্য গঠিত বাজার । ফরেক্স সারা বিশ্বে বিস্তৃত এমন একটি বাজার যেখানে মুদ্রার এই বিনিময়ের মাধ্যমে এক দেশের মুদ্রার বিপরীতে অন্য দেশের মুদ্রার মান নির্ধারিত হয় ।

উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, আপনি বাজারে গেলেন | বাজারে বিক্রির জন্য আনীত প্রত্যেকটি পণ্যের একটি মূল্য আছে যা ওই দেশে প্রচলিত মুদ্রার মূল্যমান অনুযায়ী নির্ধারিত হয় | যেমন: একটি দামি টেলিভিশনের দাম ১ লক্ষ্য টাকা, বা একটি বিলাসবহুল গাড়ির দাম ২ কোটি টাকা | সকল কিছুর মূল্য প্রচলিত মুদ্রাতে নির্ধারিত হলেও পণ্যের মান নির্ধারণকারী এই মুদ্রাটির মান নির্ধারিত হবে কিভাবে ?

এটি একটি বড় প্রশ্ন, সংক্ষেপে যার উত্তর হলো বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন কেন্দ্র বা ফরেক্স মার্কেটে ।

ভিনদেশী কোনো মুদ্রা ক্রয়ের জন্যে নিজ দেশে প্রচলিত মুদ্রার একটি অংশ মূল্য হিসেবে প্রদান করতে হয় , নিজ দেশের প্রচলিত মুদ্রার কতটুকু দিলে বিদেশী মুদ্রা পাওয়া যাবে তা নির্ধারিত হয় ফরেক্স মার্কেটে |

বিশ্বের অন্যান্য যেকোনো বাজারের মতো ফরেক্স মার্কেটেও মুদ্রার মান নির্ধারিত হয় এক দেশের মুদ্রার বিপরীতে অন্য দেশের মুদ্রার চাহিদা অনুযায়ী ।

ধরা যাক, চলতি বছরে বাংলাদেশে চীনে উৎপাদিত গাড়ির যন্ত্রাংশ অন্য বছরের তুলনায় বেশি আমদানি করা হয়েছে , ফলে অন্য বছরের তুলনায় এই বছর চীনকে অধিক পরিমানে মার্কিন ডলার প্রদান করতে হয়েছে, অন্যদিকে যে ডলারগুলো ক্রয় করা হয়েছিল দেশীয় মুদ্রা টাকার বিনিময়ে , ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমবে এবং ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পাবে |

ফরেক্স মার্কেটে কি কেনা বেচা হয় ?

খুব সহজে এই প্রশ্নের উত্তর হলো ‘মুদ্রা’ | অর্থাৎ, ফরেক্স মার্কেটে এক দেশের মুদ্রার বিপরীতে অন্য দেশের মুদ্রা ক্রয় করা হয় | অন্যান্য বাজারের তুলনায় এই মার্কেটে প্রচলিত পণ্য, অর্থাৎ মুদ্রা হয়তো হাতে ধরা যায় না বলেই এই বাজার সম্পর্কে অনেক সময় জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় |

ফরেক্স মার্কেটে বিনিময়কৃত মুখ্য কার্রেন্সিগুলো (Major Currencies of FOREX market)

SymbolCountryCurrencyNickname
USDUnited StatesDollarBuck
EUREuro ZoneEuroFiber
JPYJapanYenYen
GBPGreat BritainPoundCable
CHFSwitzerlandFrancSwissy
CADCanadaDollarLoonie
AUDAustraliaDollarAussie
NZDNew ZealandDollarKiwi

পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশকেই অন্য দেশের সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করতে হয় | ফলে, ফরেক্স মার্কেটে প্রত্যেকটি দেশেরই মুদ্রা বিনিময় হয় | কিন্তু কিছু দেশের মুদ্রা অন্যান্য সকল দেশের মুদ্রার চেয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বেশি প্রচলিত | ঐ সকল দেশের মুদ্রাগুলোকে বলা হয় মুখ্য মুদ্রা বা মেজর কারেন্সী (major currency) ।

মেজর কার্রেন্সির সংখ্যা সাতটি যা নিচের তালিকায় তুলে ধরা হলো ।

Currency PairCountriesFX Geek Speak
EUR/USDEuro/United StatesEuro dollar
USD/JPYUnited States/JapanDollar yen
GBP/USDGreat Britain/United StatesPound dollar
USD/CHFUnited States/SwitzerlandDollar swissy
USD/CADUnited States/CanadaDollar loonie
AUD/CADAustralia/CanadaAussie dollar
NZD/USDNew Zealand/United StatesKiwi dollar

উল্লেখ্য, মুদ্রার নামে তিনটি অক্ষর থাকে যার মধ্যে প্রথম দুইটি অক্ষর সেই দেশের নামকে বুঝায় এবং শেষের অক্ষরটি মুদ্রার নাম নির্দেশ করে | 

মুদ্রা জোড় বা কারেন্সী পেয়ারের ক্রয় বিক্রয়

ফরেক্স মার্কেটে একটি দেশের মুদ্রা ক্রয় করার অর্থ হলো তার বিনিময়ে অন্য দেশের মুদ্রা দিয়ে দেওয়া | যার ফলে, এই মার্কেটে মুদ্রাগুলো জোড়া আকারে বা পেয়ারে লেনদেন হয়।

যেমন: ইউরো এবং মার্কিন ডলারের পেয়ার হলো EUR/USD | কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ান ডলারের পেয়ার হলো CAD/AUD|

ফরেক্স মার্কেটের আয়তন এবং তারল্য

বিশ্বের অন্যান্য বৃহৎ অর্থবাজার যেমন নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ বা লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ এর একটি কেন্দ্রীয় বাজারের অবকাঠামো থাকলেও ফরেক্স মার্কেটে লেনদেন করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই । বিশ্বব্যাপী ফরেক্স মার্কেটটি ইলেকট্রনিকভাবে পরিচালিত হয় যার দরুন এই বাজারকে ওভার দা কাউন্টার (Over the Counter) বা ওটিসি OTC মার্কেট বলা হয় । এটি মূলত পৃথিবীর বৃহৎ ব্যাংকগুলোর মধ্যে আন্তঃব্যাংক এর আদলে পরিচালিত একটি বাজার যা দিনের ২৪ ঘন্টাই খোলা থাকে |

এর অর্থ হলো, ফরেক্স মার্কেট সারা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত যার কোনো কেন্দ্রীয় বা নির্দিষ্ট অবস্থান নেই এবং যা শুধুমাত্র একটি কম্পিউটার আর ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে পরিচালনা করা সম্ভব |

ফরেক্স মার্কেটে সবচেয়ে বহুল প্রচলিত মুদ্রা গুলোর নাম তুলে ধরা হলো

USDEURJPYGBPAUDCHFCADOthers
84.9%39.1%19.0%12.9%7.6%6.4%5.3%25.0%

মার্কিন ডলার হলো সর্বাধিক লেনদেনকৃত মুদ্রা যা ফরেক্সের মোট মুদ্রার 84.9% | দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউরো যার অংশ হলো 39.1% | 19.0% নিয়ে জাপানের মুদ্রা ইয়েন হলো তৃতীয় অবস্থানে |

মার্কিন ডলার হলো ফরেক্স মার্কেটের রাজা

ফরেক্স মার্কেটে লেনদেনকৃত মুদ্রাগুলোর মধ্যে মুখ্য মুদ্রা বা মেজর কারেন্সী (major currency) গুলোর অংশ হলো 75% | অর্থাৎ, ফরেক্স বাজারে যত ধরণের মুদ্রা বিনিময় হয় তার 75% ই মেজর কারেন্সী এবং মেজর কার্রেন্সির পেয়ারের অর্ধেকই হলো মার্কিন মুদ্রা ডলার |

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এর মতে, পৃথিবীতে যতগুলো ফরেন এক্সচেঞ্জ এর রিসার্ভ রয়েছে তার মধ্যে 64% ই মার্কিন ডলারে | কারণ প্রায় পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ন কেন্দ্রীয়ব্যাংক গুলো এবং বেশিরভাগ বিনিয়োগকারীরা, সবাই মার্কিন মুদ্রায় বিনিয়োগ করে থাকে | তাই মার্কিন অর্থনীতির বিষয়ে যেকোনো তথ্য অতি গুরুত্বপূর্ণ |

মার্কিন ডলারের এতো গুরুত্বপূর্ন হওয়ার আরো অনেক কারণ আছে যা নিচে তুলে ধরা হলো |

* যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি হলো বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি

* মার্কিন ডলার হলো বিশ্বের রিসার্ভ কারেন্সী

* মার্কিন যুক্তরাষ্টের রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ অর্থবাজার

* মার্কিন রাজনীতি অনেক স্থিস্তিশীল

* যুক্তরাষ্ট্র হলো বিশ্বের একমাত্র সামরিক পরাশক্তি

* আন্তর্জাতিক লেনদেনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাধ্যম হিসেবে মার্কিন ডলার ব্যবহার করা হয় |

ফরেক্স মার্কেটে অনুমান ভিত্তিক লেনদেন

এখানে একটি জিনিস লক্ষ্য রাখতে হবে যে যদিও এই বাজারে বাণিজ্যিক এবং আর্থিক লেনদেন ভলিউম বা চাহিদা এবং যোগানের উপর নির্ভর করে কিন্তু এইখানে সংগঠিত অধিকাংশ লেনদেনই হয় অনুমান নির্ভর | অন্য ভাষায় বলা যায় যে, এই বাজারের বেশিরভাগ বণিকরা সারাদিনব্যাপী চলমান মূল্যের উঠানামার উপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করে থাকে | যা এইখানে মোট লেনদেনকৃত অর্থের 90% |

এতো অধিক পরিমানে লেনদেন হয়, তাই বলা যায় যে, এই বাজার অন্য যেকোনো বাজারের চেয়ে অধিক তরল | অর্থাৎ, দিনের যেকোনো সময় এইখানে অধিক পরিমানে লেনদেন হচ্ছে | যার ফলে, যে কারও জন্য এই বাজারে লেনদেন করা অনেক সহজ | একজন বণিকের দৃষ্টিকোণ থেকে তারল্যের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এই তারল্যই নির্ধারণ করে দেয় যে, কত সহজে অন্য মুদ্রার বিপরীতে একটি মুদ্রার মূল্য উঠানামা করবে |

তাছাড়া, এই বাজারে লেনদেন করার কিছু কৌশলগত সময় রয়েছে যা এই বইয়ের পরবর্তী অংশে আলোচনা করা হবে |

ফরেক্স মার্কেটে লেনদেন করার বিভিন্ন পদ্ধতি 

ফরেক্স মার্কেট অনেক বৃহৎ, এই বাজার একজন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীকে লেনদেন করার নানা ধরণের সুযোগ দিয়ে থাকে | তার মধ্যে এই চারটি অন্যতম | স্পট ফরেক্স, কারেন্সী ফিউচারস, কারেন্সী অপশনস, এবং কারেন্সী এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডস|

স্পট ফরেক্স (Spot FOREX)

এই ধরণের লেনদেন হয় খুবই দ্রুতগতিতে | অর্থাৎ, একজন বিনিয়োগকারী প্রচলিত বাজার মূল্যে যেকোনো সময়ে এই লেনদেন করতে পারবেন | এই পদ্ধতি অনেক সহজ, অনেক তরল, স্প্রেড (spread) অনেক শক্ত বা নির্ধারিত, এবং দিনের ২৪ ঘন্টাই চলমান |

কারেন্সী ফিউচারস (Currency Futures)

ফিউচারস হলো একধরণের চুক্তি যেটাতে নির্দিষ্ট কিছু সম্পদ ভবিষ্যতে একটি নির্ধারিত মূল্যে ক্রয় বা বিক্রয়ের জন্য বিনিয়োগকারী সম্মতি দিয়ে থাকে | ফিউচারস চুক্তিগুলো একটি কেন্দ্রীয় স্থানে ক্রয় বিক্রয় করা হয় | ফিউচারস এর বাজারটি খুবই স্বচ্ছ এবং কঠোর নিয়ম নীতির মধ্যে পরিচালিত হয় |

কারেন্সী অপশনস (Currency Options)

অপশনস হলো এমন একটি লেনদেন পদ্ধতি যেটাতে ক্রেতাকে ভবিষ্যতে কোনো সম্পদ ক্রয় বিক্রয়ের সুযোগ দেয়া হয় | এটি একটি সুযোগ যা নেয়া বা না নেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই |

ফিউচারস এর মতোই অপশনস ও একটি নির্দিষ্ট স্থানে লেনদেন করা হয় |

কারেন্সী ইটিএফ

কারেন্সী ই টি এফ হলো এমন একটি লেনদেন পদ্ধতি যেখানে বিনিয়োগকারীকে একটি নির্দিষ্ট মুদ্রা বা একাধিক মুদ্রার সমন্বয়ে গঠিত একটি ফান্ডে বিনিয়োগের সুযোগ প্রদান করা হয় |   ই টি এফ সাধারণত বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরগুলো তৈরী করে থাকে | তারা সাধারণত এই ফান্ডের শেয়ার ক্রয় করে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীকেও এতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় | তবে এই পদ্ধতিতে লেনদেনের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো যে এই বাজারটি ২৪ ঘন্টা খোলা থাকে না এবং এটি অনেক ব্যায়বহুল |

পূর্ববর্তী পরবর্তী

Facebook Comments

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.