বাংলাদেশ ব্যাংক এর গভর্নর পদে ফজলে কবিরের মেয়াদ বাড়ছে দুই বছর

বাংলাদেশ ব্যাংক এর গভর্নর পদে ফজলে কবিরের মেয়াদ বাড়ছে দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক এর গভর্নর পদে ফজলে কবিরের মেয়াদ বাড়ছে দুই বছর

MarketDeal24.Com – আইন অনুসারে বাংলাদেশ ব্যাংক এর গভর্নরের সর্বোচ্চ বয়সসীমা হচ্ছে ৬৫ বছর। সে অনুযায়ী বর্তমান ভারপ্রাপ্ত গভর্নর ফজলে কবিরের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ৩ জুলাই। এর মধ্যেই নতুন গভর্নর নিয়োগ দিতে হবে সরকারকে। তবে নতুন কাউকে গভর্নর পদে নিয়োগ না দিয়ে ফজলে কবিরকেই বহাল রাখার বিষয়টি ভাবছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা তেমনটিই জানিয়েছেন।

তারা বলছেন, করোনা ভাইরাসের প্রকোপে আক্রান্ত অর্থনীতিকে রক্ষা করার মূল দায়িত্ব পড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর। নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের দ্বারা স্বীয় কর্তব্য পালনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক। এ অবস্থায় গভর্নরের মত নীতিনির্ধারণী ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনার ঝুঁকি না নেয়াই সমীচীন। তাই ফজলে কবিরকেই গভর্নর হিসেবে সামনের দুই বছর নিয়োজিত রাখার বিষয়টি বলতে গেলে নিশ্চিত। এই ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের চাকরির ৬৭ বছরের বয়সসীমাকে ধর্তব্যে নেয়া হচ্ছে।

জীবননাশের পাশাপাশি মহামারী করোনা ভাইরাস পাল্টে দিচ্ছে পৃথিবীর যাবতীয় রীতিনীতিও। এক মাসের অধিক সময় ধরে গৃহবন্দি সময় পার করছে বিশ্বের অন্তত ৩০০ কোটি মানুষ। নানা দেশে জারি করা হয়েছে জরুরি পরিস্থিতি। এরই মধ্যে পেছানো হয়েছে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বিশ্বের অনেক দেশই অনুসরণ করতে বাধ্য হচ্ছে শ্রীলংকার পথ। কথা উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নির্বাচন পেছানোর ব্যাপারেও। সমগ্র পৃথিবীতে অগণিত প্রতিষ্ঠানই তাদের শীর্ষ নির্বাহীর মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টায় রত আছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদেও বিকল্প ভাবতে চাইছেন না নীতিনির্ধারকরা।

রিজার্ভ চুরি

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ পদত্যাগে বাধ্য হন বাংলাদেশ ব্যাংক এর গভর্নর ড. আতিউর রহমান। ঠিক ওই দিনই গভর্নর হিসেবে ৪ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ফজলে কবির। পরবর্তীতে ২০শে মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের ১১তম গভর্নর হিসেবে কাজে যোগ দেন তিনি। সে অনুযায়ী চলতি বছরের ২০শে মার্চ ৪ বছরের চুক্তির মেয়াদ সমাপ্ত হবার কথা ছিল। তবে তার আগেই ১৬ই ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হতে প্রজ্ঞাপন জারি দ্বারা ফজলে কবিরের কার্যক্রমের মেয়াদ তার বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত বাড়ায়। আগামী ৩রা জুলাই তার বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হবে।

Forexmart

১৯৭২ সালে জারি কৃত রাষ্ট্রপতির ১২৭ নম্বর আদেশে গঠিত হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বিভিন্ন সময়ে সংশোধিত ও পরিমার্জিত হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারকে ২০০৩ সালের ১০ মার্চ বিধিবদ্ধ করা হয়। ওই সময় অর্ডারটির ১০ বিধির ৫ উপবিধিতে সংযুক্ত করা হয় গভর্নরের মেয়াদ এবং সর্বোচ্চ বয়সসীমা। এতে উল্লেখ করা হয়, গভর্নরের মেয়াদ হবে ৪ বছর। ৪ বছর সময়সীমা শেষে একই ব্যক্তিকে পুনরায় গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়া যাবে। তবে নিয়োগকৃত ব্যক্তির বয়স ৬৫ বছরের বেশি হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘকালীন গভর্নর ছিলেন এম নুরুল ইসলাম

একই ব্যক্তি যাতে দীর্ঘ সময় ধরে গভর্নর পদে না থাকতে পারেন, এজন্য ওই সময় বয়সসীমা বেঁধে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘকালীন গভর্নর ছিলেন এম নুরুল ইসলাম। ১৯৭৬ সালের ১৩ জুলাই থেকে ১৯৮৭ সালের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১১ বছর গভর্নর ছিলেন তিনি। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রায় সাত বছর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ড. আতিউর রহমান।

২০০৫ সালের ১লা মে থেকে ২০০৯ সালের ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত ৪ বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। গভর্নরের বয়স ও মেয়াদ নির্ধারণ করে দেয়ার বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমে জানান, ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের মাধ্যমে গভর্নরের সর্বোচ্চ বয়স ও মেয়াদ নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। তার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকারী অনেক গভর্নরের বয়স ৬৫ বছরের অধিক ছিল। কেন এটি করা হয়েছে, তা আমি জানি না। তবে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের বয়স নির্ধারণ করা নেই। তবে ক্ষমতাসীন সরকার যদি বর্তমান গভর্নরের মেয়াদ বাড়াতে চায়, তবে আইন সংশোধন করতে হবে।

রিজার্ভ ব্যাংক অভ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট

বাংলাদেশে গভর্নর পদে নিয়োগকৃত ব্যক্তির বয়সসীমা নির্ধারণ করে দেয়া হলেও নিকটস্থ অন্য কোনো দেশে এমনটি নেই। বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোতেও গভর্নর পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়নি। রিজার্ভ ব্যাংক অভ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৯৩৪-এর অধীনে পরিচালিত হয় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই আইনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার গভর্নর নিয়োগ দেবে। গভর্নরের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর এবং নবায়ন করা যাবে। এক্ষেত্রে কোনো বয়সসীমা উল্লেখ করা হয়নি।

ঠিক একইভাবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অভ পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেন্ট্রাল ব্যাংক অভ শ্রীলংকা, যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অভ ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর পদেও নিয়োগের বয়সসীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। এসব দেশে খ্যাতিমান ব্যাংকার কিংবা অর্থনীতিবিদদের যোগ্যতার ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সাধারণ বয়সসীমা ৩০ বছর, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের ক্ষেত্রে ৩২ বছর। সাধারণ কর্মচারীদের চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমা ৫৯ বছর। মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ৬৫, বিচারপতিরা ৬৭ বছর বয়সে অবসরে যাওয়ার সুবিধা পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদটি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়

বাংলাদেশের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৬৫ ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদটি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। এ পদের সঙ্গে সংগতি রেখেই দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৬৫ করা হয়েছে। বাংলাদেশে শুধু উচ্চ আদালতের বিচারপতিরা ৬৭ বছর পর্যন্ত চাকরিতে বহাল থাকতে পারেন। করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে ফজলে কবিরের নিয়োগ অব্যাহত রাখতে বিচারপতিদের বয়সসীমাকেই উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে ফজলে কবিরকে বহাল রাখার পক্ষে আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও। শীর্ষস্থানীয় একাধিক কর্মকর্তা বলেন, করোনা ভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে টেনে তুলতে সরকার যেসব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি প্রণয়ন করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে ফজলে কবিরের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতেই এসব নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে। করোনার তাণ্ডবলীলা শেষ হলে তবেই ঘোষিত নীতিগুলোর বেশির ভাগের বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হবে। এমন পরিস্থিতিতে গভর্নর পদে পরিবর্তন হলে নীতিরও পরিবর্তন আসতে পারে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর পরিস্থিতি বোঝার জন্য সময় নিলে, অর্থনীতির উদ্ধার প্রক্রিয়া থমকে যাবে। এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়বে।

বাংলাদেশ শেয়ার বাজার; BSEC স্বাধীন পরিচালক পর্ষদ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে

leave a reply