মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার নিবন্ধন বন্ধের কারণ হবে?

1
144 views
মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার নিবন্ধন বন্ধের কারণ হবে?
মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার নিবন্ধন বন্ধের কারণ হবে?

মার্কিন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যারা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি নির্দিষ্ট পরিমান স্বত্বের অধিকারী  হতে চান তাদেরকে মার্কিন পুঁজিবাজার তথা ওয়ালস্ট্রিট থেকে বের হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। গত দুই দশকে প্রায় ২০০টির মতো চীনা প্রতিষ্ঠান মার্কিন পুঁজিবাজারে নিবন্ধনের মাধ্যমে দেশটির উন্নত ব্যবসায়িক পরিবেশ থেকে সুযোগ নিয়েছে, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশ থেকে বেশি। এই সকল চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত, আবার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান প্রাথমিকভাবে নিবন্ধিত হয়েছে চীনে কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এক সমীক্ষা মতে, ঐ সকল প্রতিষ্ঠানগুলোর সমষ্টিগত মূল্যমান হলো $1 ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারগুলোর জন্যে এটি হচ্ছে একটি বড় ধরণের বিজয়, কিন্তু অন্যদিকে, মার্কিন যুদ্ধবাজদের চোখে তা হলো একটি দায়ের ন্যায়।

গত এপ্রিল মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটের একটি সর্বদলীয় গ্রুপ, যার নেতৃত্বে ছিলেন ফ্লোরিডা থেকে নির্বাচিত মার্কিন সিনেটর মার্কো রুবিও, একটি খোলা চিঠি প্রকাশের মাধ্যমে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা মার্কিন নাগরিকদের প্রতি হুমকির বিষয়টি তুলে ধরেন। চিঠিটির ভাষ্যমতে, “চীনের কিছু প্রতিষ্ঠান জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে অথবা মানবাধিকারের বিষয়ে একটি হুমকি।” শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে স্টিভ বেনন, যিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাচন চলাকালীন সময়ে উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি মার্কিন সিনেটরদের দেয়া এই সংজ্ঞাকে সম্প্রসারিত করে সকল প্রকারের চীনা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারগুলোকে এর আওতায় নিয়ে আসেন।

এই বিষয়ে চীনা দৈনিক পত্রিকা সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’কে দেয়া গত ২২ মে তারিখের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “মার্কিন প্রশাসনের আগামী উদ্যোগ হবে চীনা সকল প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা প্রাথমিকভাবে মার্কিন পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত হওয়ার উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং দেশের এমন সকল পেনশন ফান্ড এবং বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যারা চীনের ক্ষমতাসীন দল কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না’র সাথে লেনদেন করে।”

একজন বিশেষজ্ঞ হয়তো এই সকল হুমকিগুলোকে ফাঁকা হুমকি হিসেবে বাতাসে উড়িয়ে দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কিছু কাজ তার বিপরীত ধারণার সৃষ্টি করে জনমনে। গত মে মাসের ২৪ তারিখে Semiconductor Manufacturing International Corp (smic), যা চীনের সর্ববৃহৎ সেমিকন্ডাক্টরের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, তা ঘোষণা দিয়েছে যে খুব শিঘ্রীই নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তারা সরে দাঁড়াবে। আবার, একই মাসের ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা অঙ্গনের অন্যতম বহুল প্রচারিত মাধ্যম ব্লুম্বার্গ জানাই Alibaba, যা নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত, তা নিবন্ধনের দ্বিতীয় গন্তব্য হিসেবে হংকং এর পুঁজিবাজারকে বেঁছে নিয়েছে।

উপরে উল্লিখিত উভয় ঘটনাকেই রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে সম্পূর্ণরূপে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও ব্যাখ্যা করা যায়। কেউ কেউ বলেবেন যে smic’ এর শেয়ার যুক্তরাষ্ট্রে তেমন লেনদেন হয় না, অন্যদিকে, Alibaba দীর্ঘদিন ধরে হংকং এ নিবন্ধিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো, যার পেছনে প্রতিষ্ঠানটির দ্বারা তার মূলধন সংগ্রহের জন্যে ক্ষেত্র বৃদ্ধির অভিপ্রায়ও জড়িত।

তবে, এই পর্যায়ে এটি বলা খুবই কঠিন যে মার্কিন পুঁজিবাজারে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা নিবন্ধন বন্ধ হতে চলেছে। বরং, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে এই ধরণের কথা হলো বাণিজ্য যুদ্ধ চলাকালীন বিশেষ পরিস্থিতির একটি অবস্থা। বিশ্বের প্রধান দুই অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোর মতো বাণিজ্য, বিনিয়োগ, এবং পর্যটনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু, অন্যদিকে, শুধু গত বছরেই ২০টির মতো চীনা প্রতিষ্ঠান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত হয়, চলমান বছরে নিবন্ধিত হওয়ার কথা আরও ১২টির মতো প্রতিষ্ঠানের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন পুঁজিবাজারে নিবন্ধনের মাধ্যমে পাবে প্রচুর পরিমান তারল্য, যা তা চীনা পুঁজিবাজারে পাবে না। শুধু তাই নয়, চীনা আইন অনুযায়ী প্রযুক্তি-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে মুনাফার পরিমান বজায় রাখার বাধ্য বাধকতার কারণে চীনে ব্যবসা করা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে আরও কঠিন। তবে, গত বছর হংকং তার কোম্পানি আইনে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্যে বিশেষ ধরণের ভোটাভুটির অধিকার সম্পন্ন শেয়ার রাখার ব্যবস্থা করেছে। তারপরেও, চীনের প্রযুক্তি-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলধন সংগ্রহের জন্যে বেঁছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের Nasdaq অথবা অন্যান্য পুঁজিবাজারকে। এই সম্পর্কে Marcum bp, এর Drew Bernstein বলেন, “চীনারা মার্কিন পুঁজিবাজারকে স্বর্ণের মতো মান সম্পন্ন মনে করে।”

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত হওয়ার মাধ্যমে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে উপকৃত হয়েছে ঠিক সেইভাবে লাভবান হয়েছে মার্কিন পুঁজিবাজারও। এই বাজারে চীনা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি এই বাজারকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ পুঁজিবাজার হওয়ার শিখরে নিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের কিছু মাঝারি এবং ছোট আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা কেলেঙ্কারির ঘটনায় চীনা ঐ সকল প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারের মূল্যমান ধস নামলেও বৃহৎ  প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রদর্শন ছিলো বরাবরের মতোই ভালো।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ বেননের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার পর NASDAQ এর অন্যতম একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, “স্টিভ বেননের মতো একজন কুখ্যাত এবং প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তির মতামতের কোনো মূল্য নেই। বরং, অতীতের মতো, ভবিষ্যতেও NASDAQ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাগত জানাতে থাকবে।”

সূত্র- economist.com

Facebook Comments

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.