মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ: জানা অজানা কথা | পর্ব ৩

1
154 views
মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ
FILE PHOTO: মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ

MarketDeal24.Com – মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ সম্পর্কিত তৃতীয় পর্বের আজকের আলোচনায় আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো এই যুদ্ধের সামগ্রিক প্রভাব, পুঁজিবাজারের উপরে এর প্রভাব, এবং সর্বশেষ বিশ্বের অন্যান্য দেশের উপরে এর প্রভাব।

মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব

২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে চীন সরকার কর্তৃক ঘোষণা করা হয় যে, বিদেশী মোটরযান এবং পানিজাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিনে বিনিয়োগ করতে হলে সরকার অনুমোদিত চীনা অংশীদারের আর প্রয়োজন হবে না। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং এই সকল কর্মসূচীগুলোকে জনসম্মুক্ষে তুলে ধরেন এবং তার সরকার কর্তৃক দেশে আমদানির পরিমান বৃদ্ধি, উৎপাদনখাতে বৈদেশিক মালিকানার পরিমান বৃদ্ধি, এবং মেধাস্বত্ব অধিকার রক্ষার জন্যে আরো কঠোর হওয়া ইত্যাদি। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চীনা প্রেসিডেন্টের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান।

তবে ২০১৮ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরোপিত শুল্কগুলোর মিশ্র প্রভাব পড়া শুরু হয়ে যায়, অনেকগুলো শিল্পখাত কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করলেও, অনেক শিল্পখাত আবার গণহারে কর্মী ছাটাই শুরু করে।

এই বাণিজ্য যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাত হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিখাত। ২০১৪ সালে চীনে যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা রপ্তানিকৃত কৃষিজাত পণ্যের পরিমান ছিল $24 বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৮ সালে এসে দাঁড়ায় $9.1 বিলিয়ন ডলার মূল্যমানে। এই হ্রাসের মধ্যে অবশ্য মার্কিন শূকর, সয়াবিন, এবং গমও অন্তর্ভুক্ত। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে কৃষিখাতে নিয়োজিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দেউলিয়াত্বের পরিমান বৃদ্ধি পায়। দেশটির কৃষিখাতের এক অন্যতম সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান Deere & Company ২০১৯ সালে তার দ্বারা অর্জিত সম্ভাব্য মুনাফার পরিমানের হিসেবের মধ্যে দুইদফা নিম্নমুখী সমন্বয় আনে। তবে, এতকিছুর পরেও চলমান ২০১৯ সালের জুলাই মাসে দেশটির কৃষিখাতে পরিচালিত এক সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী ৭৮% ভাগ কৃষক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতিকে সমর্থন করতে থাকে এই আশায় যে, ভবিষ্যতে এই বাণিজ্য যুদ্ধের দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।

মার্কিন-চীন চলমান বাণিজ্য

মার্কিন-চীন চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরকে সাহায্য করার জন্যে ট্রাম্প প্রশাসন দুই ধাপে $28 বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করে। শুধু তাই নয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরো ঘোষণা করেন যে, চীনা পণ্যের উপরে আরোপিত শুল্কের অর্থ দিয়ে তার প্রশাসন দেশীয় কৃষকদের নিকট থেকে পণ্য ক্রয় করে দেশের অনত্র বিলি করবে।

এদিকে, ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি মন্ত্রণালয় একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, “চীন দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গমের আমদানি হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি কানাডা থেকে চীনের গমের আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুনে। যা ৩২% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এখন ৬০% এ এসেছে। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের দ্বারা নতুন করে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না করার সিদ্ধান্তে কৃষিখাতে যন্ত্রপাতি বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার পরিমানও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।

২০১৯ সালের জানুয়ারী মাসের ১৪ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের এক অন্যতম বহুল পঠিত পত্রিকা দি ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল এক সংবাদ প্রবন্ধের মাধ্যমে জানায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা শুল্ক আরোপের পরেও বিশ্বের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ অর্থনীতি চীনের বাণিজ্য উদ্বৃতি এখন $323.32 বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফেব্রূয়ারি মাসের ৬ তারিখে দি নিউইয়র্ক টাইমস এক সংবাদ প্রবন্ধের মাধ্যমে জানায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চতায় অবস্থান করছে, যার পরিমান হচ্ছে $621 বিলিয়ন ডলার। তাছাড়া, দেশটির খুচরা বণিকদের সংগঠন ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশন অফ ইউনাইটেড স্টেটস ঘোষণা করে, চীন থেকে আমদানিকৃত আসবাবপত্রের উপরে ২৫% হারে শুল্কের আরোপের কারণে মার্কিন ভোক্তাদের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে $4.6 বিলিয়ন ডলার হারে (বাৎসরিক)।

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক পেটেরসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্স এর দ্বারা প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে চীন দ্বারা অন্যান্য দেশগুলোর পণ্যের উপরে আরোপিত আমদানি শুল্কের গড় হার ছিল ৮%, কিন্তু, ২০১৯ সালের জুলাই আসতে আসতে মার্কিন পণ্যের উপরে চীনের দ্বারা আমদানি শুল্কের পরিমান বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২০.৭%। তাছাড়া, অন্যান্য দেশগুলোর পণ্যের উপরে আমদানি শুল্কের পরিমান হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৬.৭%। ঐ বিশ্লেষণে আরো উঠে আসে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা চীনা পণ্যের উপরে আরোপিত শুল্কের পরিমান ৩.১% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২৪.৩%।

পুঁজিবাজারের উপরে বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব

বিশ্বের সর্ববৃহৎ দুই অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় পুঁজিবাজারগুলোর উপরে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখে মার্কিন পুঁজিবাজারের অন্যতম জনপ্রিয় সূচক Dow Jones Industrial Average, স্মরণকালে তার সবচেয়ে খারাপ প্রদর্শন করে। মাত্র একদিনেই এর মূল্যমান হ্রাস পায় ৬০০ পয়েন্টস। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসের ১৪ তারিখে ঐ সূচক হ্রাস পায় ৮০০ পয়েন্টস হারে। শুধু তাই নয়, তার নয়দিন পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চীন থেকে বাণিজ্য বন্ধের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার জন্য অন্য কোনো উৎস খুঁজে বের করার আহ্বান জানানোর কারণে মাত্র এক ট্রেডিং সেশনে সূচকটি তার মূল্যমানে হ্রাস পায় ৬২৩ পয়েন্টস।

বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য যুদ্ধের প্রভাব

মার্কিন-চীন চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমান হ্রাস পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এই যুদ্ধ ইউরোপের বিশেষ করে জার্মানির অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে ভালোই। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সাথে রয়েছে জার্মানির ভালো সম্পর্ক। অন্যদিকে, কানাডার অর্থনীতিও প্রভাবিত হয়েছে নেতিবাচকভাবে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প-উৎপাদনখাতও কর্মতৎপরতার মধ্যে ভাটা প্রদর্শন করে। ফলে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশগুলো নিজেদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্যে ঘোষণা করেছে বিভিন্ন ধরণের অর্থনৈতিক প্রণোদনার।

তবে, কিছু কিছু দেশ আছে যা এই যুদ্ধ থেকে লাভবান হয়েছে যেমন ভিয়েতনাম, চিলি, মালয়েশিয়া, এবং আর্জেন্টিনা। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাভবান হলো ভিয়েতনাম। বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির প্রযুক্তি খাতের দ্বারা উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। মালয়েশিয়া লাভবান হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে সেমিকন্ডাক্টরের রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে। মক্সিকো বৃদ্ধি করে মোটরযানের রপ্তানি, অন্যদিকে, ব্রাজিল বৃদ্ধি করে সয়াবিনের রপ্তানি।

এর পরের পর্বে আমরা আলোচনা করবো এই যুদ্ধের ব্যপারে চীনের অভ্যন্তরীন প্রতিক্রিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া।

US CHINA TRADE WAR | মার্কিন-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ: জানা অজানা কথা | পর্ব

Facebook Comments

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.