মার্কেট রিটার্নের অভাবে বিনিয়োগকারীরা বাজার ছাড়ছেন

হাইলাইটস:


সক্রিয় বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা:

  • ২০১০ সালে ২৫.৭১ লাখ
  • ২০২০ সালে ২২.৯৯ লাখ
  • গত ১০ বছরে অ্যাকাউন্ট কমেছে ২.৭২ লাখ
  • ২০১৫ সালে সক্রিয় অ্যাকাউন্ট ছিল ৩১.৯৬ লাখ- যা এক দশকের সর্বোচ্চ
  • ২০১০ সালে বিনিয়োগকারীরা ১০০ টাকার বিনিয়োগে ৮২ টাকা করে লাভ করে
  • ২০১৯ সালে বিনিয়োগকারীরা ১০০ টাকার বিনিয়োগে ১৭ টাকা লোকসান করে
  • বিনিয়োগকারীরা এরপর পুঁজিবাজার ত্যাগ করে টানা লোকসানে
  • ২০১০ সালের ব্যাপক পতনের পর কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু আইন জারি করে, নেয়া হয় সংস্কারমূলক ব্যবস্থা। তবে তাতে বিনিয়োগকারীরা লাভবান হয় না।

গত ১০ বছরে দেশের অর্থনীতি খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। যদিও শেয়ার মার্কেটের জিডিপিতে (GDP) অবদান কমতে থাকে। অনেক বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়ে পুঁজিবাজার ত্যাগ করে।

২০১০ সালে বাংলাদেশে স্টক মার্কেট রিটার্ন ছিল ৮২%, ১০০ টাকা বিনিয়োগের পিছনে ৮২ টাকা ছিল মুনাফা। সেই বছর তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার মূল্য বেড়ে যায় বহুগুণে।

সেই একই বছরে ভারতের মার্কেট রিটার্ন ছিল ১৭.৪%, পাকিস্তানে ছিল ২৮.১% এবং শ্রীলঙ্কায় ছিল ৯৬%।

Forexmart

২০১৯ সালে ভারতে যা ছিল ১৪.৪%, ৯.৯% ছিল পাকিস্তানে এবং শ্রীলঙ্কায় ছিল ১.৩%, যেখানে বাংলাদেশী বিনিয়োগকারীরা ১৭% মূলধন হারায়।

এ বছর জুনে ভারতে যা ছিল ৮.৩%, ১.৬% ছিল পাকিস্তানে এবং শ্রীলঙ্কায় ছিল ১৫.৪%, যেখানে বাংলাদেশী বিনিয়োগকারীরা ১০% এ অবস্থান করছিল।

ইউসিবি ক্যাপিটাল

ইউসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রহমত পাশা বলেন, ‘মার্কেট রিটার্নের উপর নির্ভর করে বিনিয়োগকারীদের অর্থের পরিমাণ। সকলে পুঁজিবাজারে আসে মুনাফার আশায়। গত কয়েক বছরে তাই বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বেড়েছে যাতে করে কোম্পানিগুলো আরো বেশি মুনাফার সন্ধান দিতে পারে। এই বছরের জুন পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা ১০০ টাকার বিপরীতে ১০ টাকার লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে। তাই বর্তমানে সাধারণ জনগণ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক নয়।’

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের বক্তব্য অনুযায়ী এই বছরের জুলাইতে আড়াই লাখের মতো বিও একাউন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে পুঁজিবাজারে ২৩ লাখ বিও একাউন্ট রয়েছে যা বিগত এক দশকে সর্বনিম্ন।

২০১০ সনে ২৫.৭১ লাখ চালু বিও একাউন্ট ছিল যা প্রতিবছর বেড়েছে। ২০১৫ সালে সংখ্যাটা ২১.৯৬ লাখে দাঁড়ায় যা গত দশকে সর্বোচ্চ।

কিন্তু বিগত ছয় বছরে ৮.৯১ লাখ বিও একাউন্ট বন্ধ হয়েছে গেছে। এখন পর্যন্ত স্টক মার্কেটে ৭০ লাখের মত একাউন্ট খোলা হয়েছে।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আবু আহমেদ বলেছেন যে নতুন আইন এবং কাঠামোগত পরিমার্জনের পরও ভাল কোম্পানিগুলো পুঁজি বাজারের দিকে আকর্ষণ বোধ করছে না, আর তাই বাজার সংকোচন ঘটছে।

তিনি আরো বলেন, “যেখানে অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতগুলো এগিয়ে গেছে সেখানে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে বহুলোক তাদের সর্বস্ব হারিয়েছে। বছরের পর বছর লোকসান করার কারণে বিনিয়োগকারীরা বাজার ছেড়ে যাচ্ছে। এবং তাদের বিও একাউন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের ডিরেক্টর ডক্টর খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম পুঁজিবাজারকে পেছনে টেনে রাখার জন্য দায়ী পাঁচটা মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করেছেন। সেগুলো হচ্ছে: আইপিও-এর নিম্ন মান, আর্থিক প্রতিবেদনে অস্বাভাবিকতা, বিও একাউন্টে স্বচ্ছতার অভাব, সেকেন্ডারি মার্কেটে সন্দেহজনক ট্রেডিং, এবং বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের প্রশ্নবিদ্ধ কার্যকলাপ।

তাছাড়াও ‘জেড’ ক্যাটাগরি শেয়ারের মূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর দেয়া স্বল্প লভ্যাংশ এবং বানিজ্যিক ব্যাংক দ্বারা জোরপূর্বক শেয়ার বিক্রয় ইত্যাদি বিষয়গুলোও সমস্যা সৃষ্টি করে থাকে।

ডক্টর মোয়াজ্জেম বলেন, “বাজারে সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সক্ষমতার অভাবের ফলে বিনিয়োগকারীরা অল্প সময়ের জন্য বাজারে প্রবেশ করে আবার বেরিয়ে যায়। তারা দীর্ঘ মেয়াদি বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক থাকে না।”

তিনি যোগ করেন, “এই পরিস্থিতিটা বদলানো সম্ভব কেবলমাত্র পুঁজি বিনিয়োগের বেলায় মূল দুর্বলতা অপসারণের মাধ্যমে। একজন বিনিয়োগকারী তখনই বাজারের প্রতি আস্থা রাখতে পারবে যখন নিয়ন্ত্রকরা বাজারে সৃষ্ট ত্রুটি বিচ্যুতিকে নির্ণয় এবং সমাধা করতে পারবে।’

ডক্টর মোয়াজ্জেমের মতে নতুন কমিশনের এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

বিও একাউন্টের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘কিছু বিও একাউন্ত প্রতিবছর চালু থাকলেও অনেক বিও একাউন্টই সচল থাকে না। তাছাড়া বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীরাও আসছে। সুতরাং এইসব একাউন্টের বিষয়ে স্বচ্ছতা জরুরী।’

ডক্টর মোয়াজ্জেম মনে করেন যে বিও একাউন্ট খোলার জন্য টিন নাম্বার এবং এনআইডি নাম্বারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক হওয়া জরুরী। বিও একাউন্টের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেলে স্টক মার্কেটে অনিয়ম হ্রাস পাবে।

ব্যারিস্টার এম মাসুম বলেছেন যে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারে তাদের কাছ থেকে আশানুরূপ আচরণ করেনি।

তিনি বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় বাজারে লেনদেনও বৃদ্ধি পায়নি। তাছাড়া বিশ্ববাজারে স্টক মার্কেট ডিজিটাল হয়ে গেলেও আমাদের এখানে এখনও অনলাইন লেনদেন চালু হয়নি।’

ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন

ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট শরিফ আনোয়ার হোসেন জানান অনেক বিনিয়োগকারী ব্রোকারেজ ফার্ম থেকে ঋণ নিয়ে তারপর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে। লোকসানে পড়লে তারা পুঁজিবাজার ছেড়ে চলে যায়। তিনি বলেন গত ১০ বছরে ১০০ কোম্পানি পুঁজি সংগ্রহ করেছে কিন্তু অল্প কিছু কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে।

সিডিবিএলের গবেষণা বলছে সক্রিয় ৩.৩৮ লাখ বিও অ্যাকাউন্ট কখনোই ব্যবহৃত হয়নি এবং ৭.৩৫ লাখ বিও অ্যাকাউন্টে কোনো টাকাই নেই। শেয়ার ব্যালেন্স থাকা বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১২.২৬ লাখ।

বিও অ্যাকাউন্ট ছাড়া একজন বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে কোনো ধরনের লেনদেন সম্পন্ন করতে পারে না। একজন অ্যাকাউন্ট হোল্ডারকে অবশ্যই তা অ্যাকাউন্ট রিনিউ করতে হয় ৪৫০ থেকে ১০০০ টাকা চার্জ হিসেবে দেয়ার মাধ্যমে যা দিতে হয় ব্রোকারেজ ফার্মগুলোকে।

শেয়ারহোল্ডার সভায় ইলেকট্রিক ভোটিং এর নিয়ম জারি

২ Comments

leave a reply