ECONOMY GRAPH BANGLA | করোনা পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির গ্রাফ কোন আকার ধারণ করতে পারে?

ECONOMY GRAPH BANGLA | করোনা পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির গ্রাফ কোন আকার ধারণ করতে পারে? ECONOMY GRAPH BANGLA | করোনা পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির গ্রাফ কোন আকার ধারণ করতে পারে?

ECONOMY GRAPH BANGLA – সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে চলমান করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি। বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটায় ইউরোপের দেশগুলো বর্তমানে লকডাউন এবং অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসছে। বেরিয়ে আসতে চাইছে আরো অগণিত রাষ্ট্র। দক্ষিণ এশিয়াসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু হয়েছে সীমিত পরিসরে। এরই মধ্যে করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি কেমন হবে, সে বিষয়ে চলছে নানা ধরনের বিচার- বিশ্লেষণ।

অর্থনীতি শাস্ত্রের পরিভাষায়, একটি দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতিপ্রকৃতি রেখাচিত্রে (গ্রাফ) উপস্থাপন করা হলে তা যে আকৃতি নেয়, সে আকৃতি বিবেচনায় মন্দাকালীন অর্থনীতিকে কয়েকভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত হলো চারটি – ভি-শেপড রিসেশন বা ইংরেজি ‘ভি’ আকৃতির মন্দা, ইউ-শেপড রিসেশন বা ‘ইউ’ আকৃতির মন্দা, ডব্লিউ-শেপড রিসেশন বা ‘ডব্লিউ’ আকৃতির মন্দা এবং এল-শেপড রিসেশন বা ইংরেজি ‘এল’ আকৃতির মন্দা।

ভি-শেপড মন্দা

এর মধ্যে ভি-শেপড মন্দা বলতে বোঝায় যখন অর্থনীতির পতন ঘটে খুব স্বল্প সময়ে এবং দ্রুততার সাথে, আবার সেখান থেকে পুনরুদ্ধারও হয় খুব দ্রুত শক্তিশালী আকারে। অর্থনীতির এ পতন ও উত্থানকে রেখাচিত্রে উপস্থাপন করা হলে তা ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো আকৃতি ধারণ করে। এক্ষেত্রে পতন ও পুনরুদ্ধারের গতি-দুটোই বেশ শক্তিশালী গঠনের হয়ে থাকে।

ইউ-শেপড মন্দা

ইউ আকৃতির মন্দার ক্ষেত্রে সময়কাল ভি আকৃতির তুলনায় কিছুটা দীর্ঘায়িত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে পতনের পর নতুন করে উত্থানের আগে অর্থনীতি বেশ কিছুদিন তলানিতে অবস্থান করে। রেখাচিত্রে উপস্থাপন করা হলে তা ‘ইউ’ অক্ষরের আকৃতি ধারণ করে।

Forexmart

ডব্লিউ-শেপড মন্দা

ডব্লিউ আকৃতির মন্দার ক্ষেত্রে অর্থনীতি একেবারে তলানিতে নেমে আসার পর কিছুদিনের জন্য ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে। এরপর চূড়ান্তভাবে উত্থানের আগে আবারো কিছুদিনের জন্য মন্দা ফিরে আসে অর্থনীতিতে। গ্রাফে এ উত্থান-পতনকে উপস্থাপনের পর তা ইংরেজি ডব্লিউ অক্ষরের আকৃতি ধারণ করে।

এল-শেপড মন্দা

মহামন্দা বা এ ধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতি গ্রাফে উপস্থাপনের পর এর সাথে ইংরেজি এল অক্ষরের কিছুটা মিল পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে অর্থনীতি গভীর মন্দায় পড়ার পর প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে বেশ খানিকটা সময় প্রয়োজন পড়ে। অর্থনীতি ধারাবাহিক সংকোচনের পর তা কিছু সময়ের জন্য নিশ্চল হয়ে পড়ে। এ কারণে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এল আকারের মন্দার আশঙ্কা দেখা দিলে বরাবরই অর্থনীতিবিদরা অস্বস্তিতে পড়ে যান।

করোনাজনিত মন্দা ও পরবর্তী পরিস্থিতি অর্থনীতিকে এই চার আকৃতির যে কোনো একটি রূপ দিতে পারে। ভারত সরকারের প্রধান অর্থনীতিবিদ কেভি সুব্রামনিয়াম মনে করছেন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি হবে ভি-আকৃতির। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চলমান মহামারী পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লু-এর সময়কার পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা দিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি ভারতীয় এক গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে কেভি সুব্রামনিয়াম বলেন, যেকোনো রোগের ক্ষেত্রে গড়ে একজন ব্যক্তির অন্যদের সংক্রমিত করার পরিমাপক আরও প্যারামিটার অনুযায়ী, করোনা মহামারীর ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি গড়ে ২ দশমিক ৪ জনকে সংক্রমিত করে। স্প্যানিশ ফ্লুয়ের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ছিল ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ২ জন করে। প্রতি বছর যে সাধারণ ফ্লু রোগ দেখা দেয়, তার ক্ষেত্রে এ হার ১ দশমিক ৩। গুটিবসন্ত বা ইবোলার ক্ষেত্রে তা সাড়ে তিন। সুতরাং মহামারী এবং মহামারীর ব্যাপ্তি বিবেচনায় স্প্যানিশ ফ্লুয়ের সময়কালকেই বর্তমানের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যেহেতু স্প্যানিশ ফ্লুয়ের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হয়েছিল ভি আকারের গতিতে, সেহেতু বর্তমানের ক্ষেত্রেও আমরা এর পুনরাবৃত্তি প্রত্যাশা করতে পারি। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এটাই হবে।

ভারতীয় অর্থনীতি

এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ভারতীয় অর্থনীতির সম্ভাব্য গতি সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়ে তিনি বলেন, প্রথম প্রান্তিকে (ভারতে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক হিসেবে এপ্রিল-জুন সময়কালকে ধরা হয়) অর্থনীতি সংকুচিত হবে। যেহেতু আমরা ধীরে ধীরে সব খুলে দিচ্ছি দ্বিতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর ও জানুয়ারি-মার্চ) অর্থনীতি গতিশীল হয়ে উঠবে। সুতরাং সার্বিক দিক বিবেচনায় বলা যায়, প্রকৃত প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ২ শতাংশে।

তবে এই বিশ্লেষণের মধ্যেও একটি ‘কিন্তু’ রেখেছেন কেভি সুব্রামনিয়াম। তার ভাষায়, বর্তমান অনিশ্চিত প্রেক্ষাপটে অচলাবস্থার মধ্যে সর্বোচ্চ এটুকুই প্রত্যাশা করা যায়।

অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আইএনজি গ্রুপের এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য কেভি সুব্রামনিয়ামের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারছে না। এতে বলা হয়, শুধু সবচেয়ে ইতিবাচক দৃশ্যপট নিশ্চিত করা গেলেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ভি-আকৃতির পুনরুদ্ধার সম্ভব। সেক্ষেত্রে গোটা বিশ্বকেই চীনের মতো দ্রুত পুনরুত্থান নিশ্চিত হতে হবে। এক্ষেত্রে কঠোর লকডাউনের মাধ্যমে শুধু ভাইরাসের সংক্রমণকে দ্রুত দমন নয়; একই সঙ্গে সবকিছু খুলে দেয়ার পর দ্রুতগতিতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও পূর্ণ উদ্যমে ও পুরোমাত্রায় ফিরে আসা নিশ্চিত করতে হবে। একমাত্র এ ধরনের দৃশ্যপটেই ভি-আকৃতির পুনরুদ্ধার সম্ভব।

গবেষণায় সম্ভাব্য সব ধরনের পরিস্থিতি সম্পর্কেই আলোচনা তুলে ধরা হয়। এতে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি এল-এর আকৃতি ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। সংস্থাটি বলছে, যদি বিভিন্ন দেশে বছরের পুরো সময় নানা মাত্রায় লকডাউন বজায় রাখতে হয়, সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে একেবারে তলানিতে। সেক্ষেত্রে গোটা বিশ্ব আর্থিক পুনরুদ্ধারের পথে যাত্রা করতে করতে সময় লেগে যেতে পারে ২০২১ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক (এপ্রিল-জুন)। অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতির করোনা পূর্ববর্তী অবস্থানে আসতে আসতে সময় লেগে যেতে পারে ২০২৩ সাল।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্তিতি

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসী যদি মহামারী করোনাকে সাময়িকভাবে দমন করতে সক্ষম হয় এবং শীতকালে এটি আবার ফিরে আসে সেক্ষেত্রে সবাইকেই এর জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। এক্ষেত্রে যদি সংক্রমণ পরীক্ষার সুযোগ-সুবিধা আরো বাড়ানো যায় এবং পশ্চিমের দেশগুলো আবারো কড়াকড়ি আরোপের মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধে সক্ষম হয়, সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি হতে পারে ডব্লিউ আকৃতির। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বর্তমানের অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার মধ্যেই আবারো প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে ভাইরাসটিকে পরেরবার আরো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করা গেলে চূড়ান্ত পর্যায়ে দ্রুতগতিতে পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় পুনরুদ্ধার ‘ইউ’-আকৃতিতেই হবে বলে আইএনজির ওই গবেষণা প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেয়া হয়, এক্ষেত্রে সংক্রমণ ধীর হয়ে আসার পর বিভিন্ন দেশের সরকার চলতি মাসের শেষ দিক নাগাদ একটু একটু করে লকডাউন শিথিল করতে থাকবে। সেক্ষেত্রে কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্ব স্বাভাবিক পরিস্থিতির কাছাকাছি চলে আসতে পারবে। এক্ষেত্রে তখনো ভ্রমণ সীমাবদ্ধতা  আরোপিত ও হোম অফিস ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। এবং রেস্টুরেন্ট ও সিনেমা হলের মতো জায়গাগুলো খুলতে হবে ধীরে ধীরে, স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখে। এছাড়া জনসমাবেশ বন্ধ রাখার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের জন্য সবার মধ্যে সামাজিক দূরত্বের নীতিও বজায় রাখতে হবে।

এ বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান প্রিভিডিয়ারের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু ডুগুয়ের কথা অনুযায়ী, তথাকথিত ও বহুল উচ্চারিত ভি-আকৃতির পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নেই। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মহামারীর কারণে অভূতপূর্ব কাঠামোগত এবং মানসিক দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর রাতারাতি অক্ষত ও অপরিবর্তিত অবস্থায় পুনরুদ্ধারের দিকে এগিয়ে যাবে, এটি এক ধরনের অবাস্তব ধারণা।

তার মতে, বৈশ্বিক মহামারী দূরের কথা, সবচেয়ে ভালো সময়েও অর্থনৈতিক পূর্বাভাস দেয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। কিন্তু এক্ষেত্রেও কিছু সম্ভাব্য দৃশ্যপটের কথা বলা যায়, যেগুলোর সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। বছরের শেষার্ধে আমরা কিছু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রত্যক্ষ করতে পারি। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি কিছুটা ভালোর দিকে যেতে পারে এবং ভোক্তারা অর্থনীতিতে আবারো কিছুটা গতি সঞ্চার করতে পারেন।

প্রিভিডিয়ারের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু ডুগুয়ের বলেন

অ্যান্ড্রু ডুগুয়ের আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদা দুর্বল হয়ে আসার কারণে সামনের দিনগুলোয় শিল্পোৎপাদনে শ্লথতা বজায় থাকবে। অন্যদিকে বছরের গোটা সময়জুড়েই ভোক্তা পর্যায়ে অনিশ্চয়তা এবং বাজারের অস্থিতিশীলতা বজায় থাকতে পারে। শ্রমবাজারের একাংশ কাজে ফিরে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য চালু হলেও ভোক্তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য ও কর্মনিরাপত্তা-সংক্রান্ত আশঙ্কা বিরাজ করবে। এছাড়া কোম্পানিগুলো বাজেট কর্তন ও লে-অফের কারণে নিজের অবস্থান তৈরিতেই হিমশিম খেয়ে যাবে। পাশাপাশি অস্থিতিশীল আর্থিক বাজারও স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে হিমশিম খেয়ে যাবে। এছাড়া দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাসের কারণে ভোক্তা আচরণেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এছাড়া কিছু কিছু শিল্প খাতে ঋণখেলাপির সংখ্যাও বাড়তে পারে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তার অভিমত, বিশেষজ্ঞরা সবাই এখন পরবর্তী মহামন্দা থেকে দ্রুত আর্থিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা পর্যন্ত নানা ধরনের পরিস্থিতির কথা বলছেন। বাস্তবতা হলো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতিপ্রকৃতিটি হবে এর মাঝামাঝি ধরনের। সম্ভাবনা আছে, বছরের শেষ পর্যন্ত আমরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাব। নিত্যনতুন সুযোগ ও শিল্প খাতের পুনর্বিন্যাসকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে সময় লেগে যেতে পারে ২০২১ সাল পর্যন্ত। সেক্ষেত্রে প্রত্যাশা করা যায় পুনরুদ্ধার হবে ইউ-আকৃতিতে। ECONOMY GRAPH BANGLA

বৃহস্পতিবার বাজারে লক্ষ্য রাখার মতো ৫ টি বিষয় | ৭ই মে, ২০২০

leave a reply